নিম পাতার গুড়া খাওয়ার সহজ নিয়ম ও টিপস
আপনি কি নিম পাতার গুড়া খাওয়ার নিয়ম জানতে চান? আসলে নিম পাতার গুড়া আমাদের
শরীরের জন্য খুবই উপকারী একটি উপাদান। বিশেষভাবে এটি আমাদের ডায়াবেটিস
নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
তাই আমাদের সকলেরই নিম পাতার গুড়া কিভাবে খাওয়া উচিত তা জানা উচিত। বিস্তারিত
জানতে চাইলে সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।
পোস্ট সূচিপত্রঃ নিম পাতার গুড়া খাওয়ার নিয়ম
নিম পাতার গুড়া খাওয়ার নিয়ম
আমরা অনেকেই জানি যে নিম পাতার গুড়া খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। তবে আমরা
জানি না নিম পাতার গুড়া খাওয়ার নিয়ম কি। তাই চিন্তার কোন কারণ নেই কারণ আজকে
আমি এই পোস্টে নিমপাতার গুড়া সম্পর্কে সকল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আপনি
যদি নিম পাতার গুড়া খেতে চান তাহলে অবশ্যই আপনার নিয়ম করে খাওয়া উচিত। চলুন
তাহলে জেনে নিই নিম পাতার গুড়া খাওয়ার সঠিক নিয়ম।
আরও পড়ুনঃ টনসিল ফোলা কমানোর ঘরোয়া কার্যকরী উপায়
এই নিম পাতার গুড়া সকালে খালি পেটে খাওয়া সবচেয়ে উত্তম। তবে আপনি চাইলে রাতে
ঘুমানোর আগে হালকা পেট থাকা অবস্থায় খেতে পারেন। আবার কতটুকু খেতে হবে তা আমরা
জানিনা তাই কতটুকু খাবেন আমি আপনাদের বলছি সাধারণত ½ চা চামচ অর্থাৎ প্রায় ১-২
গ্রাম মত খাবেন তবে দিনে ১ বারের বেশি নয়। আবার আপনি টানা মাসের পর মাস খেলে
বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে তাই একটানা ২০-৩০ দিন খাবেন এরপর ৭-১০ দিন বিরতি
দিবেন। প্রয়োজন হলে আবারও এভাবেই খাওয়া শুরু করবেন। এটিই ছিল নিম পাতার গুড়া
খাওয়ার সঠিক নিয়ম।
নিম পাতার গুড়া খাওয়ার উপায়
নিম পাতার গুড়া যেহেতু তিতা তাই নিম পাতার গুড়া খাওয়ার উপায় গুলো আমাদের জানা
উচিত। তিতা ভাব এড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি কার্যকরী উপায় রয়েছে। এই উপায়গুলো
অবলম্বন করে খেলে নিম পাতার তিতা স্বাদ থেকে বাঁচতে পারবেন। অনেকে আবার এই তিতা
ভাবের কারণে উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও নিম পাতার গুড়া খেতে চাই না। তাই চলুন
জনপ্রিয় কিছু নিম পাতার গুড়া খাওয়ার উপায় গুলো জেনে নেই।
- পানির সাথে
½ চা চামচ নিম পাতা গুড়া
এক গ্রাস কুসুম গরম পানি
সকালে খালি পেটে পান করুন। শরীর ডিটক্স ও হজমে ভালো কাজ করে।
- মধুর সাথে
½ চা চামচ নিম পাতার গুড়া
১ চা চামচ খাঁটি মধু
এগুলো ভালোভাবে মিশিয়ে খান এতে তিতা স্বাদ কমে যাবে।
- লেবু পানির সাথে
½ চা চামচ নিম পাতার গুড়া
কুসুম গরম পানি
কয়েক ফোটা লেবুর রস
এটি রক্ত পরিষ্কার ও ত্বকের জন্য ভালো
- ক্যাপসুল বানিয়ে
নিম পাতার গুড়া খালি ক্যাপসুলে ভরে
পানি দিয়ে গিলে ফেলুন
এই উপায়ে খেলে যারা তিতা সহ্য করতে পারে না তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।
নিম পাতার গুড়া খাওয়ার উপকারিতা
নিম পাতার গুড়া খাওয়ার উপকারিতা গুলো জানলে আমরা সকলেই নিম পাতার গুড়া খেতাম।
আজ আমি আপনাদের নিম পাতার গুড়া খাওয়ার উপকারিতা গুলো পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে
বলব।
- রক্ত পরিষ্কার করে
শরীরের ভেতরের টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে ফলে ত্বক পরিষ্কার থাকে।
- ব্রণ ও ত্বকের সমস্যা কমায়
ব্রণ, ফুসকুড়ি, চুলকানি ও এলার্জিতে উপকারী।
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
রক্তের শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
- ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
- পেটের সমস্যা দূর করে
গ্যাস, বদ হজম ও কৃমি দূর করে
- লিভার সুস্থ রাখতে সাহায্য করে
লিভার পরিষ্কার রাখতে ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে
- প্রদাহ ও সংক্রমণ কমায়
মিমের এন্টি ব্যাকটেরিয়াল ও এন্টিফাঙ্গাল গুণ সংক্রমণ প্রতিরোধ করে
- প্রজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
হজম ভালো রেখে মেটাবলিজম উন্নত করে
- মুখের দুর্গন্ধ কমায়
শরীর ভেতর থেকে পরিষ্কার রাখার কারণে মুখের বাজে গন্ধ কমে।
- চুলের স্বাস্থ্যে উপকার করে
খুশকি ও চুল পড়া কমাতে সাহায্য করতে পারে। সাধারণত নিম পাতার গুড়া খেলে এ সকল
উপকারিতা গুলো আপনি দেখতে পাবেন।
নিম পাতার গুড়া খাওয়ার অপকারিতা
নিম পাতার গুড়া খাওয়ার অপকারিতা জানা খুব জরুরী কারণ যাতে ভুল ভাবে খেয়ে কোন
উপকার ক্ষতি না হয়। নিম পাতার গুড়া খাওয়ার উপকারিতা থাকলেও এর কয়েকটি
অপকারিতাও রয়েছে। তাই আসুন জেনে নিই নিম পাতার গুঁড়া খাওয়ার অপকারিতা গুলো কি
কি।
- অতিরিক্ত খেলে বিষক্রিয়া হতে পারে
- লো ব্লাড সুগার হওয়ার ঝুঁকি
- পেটের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে
- গর্ভবতী নারীদের জন্য ক্ষতিকর (বিশেষভাবে)
- দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য নিরাপদ নয়
- দুর্বল বা রোগা মানুষের সমস্যা বাড়াতে পারে
- লিভার বা কিডনিতে চাপ ফেলতে পারে
- এলার্জির প্রতিক্রিয়া হতে পারে
- হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে
- শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ
নিম পাতার গুঁড়া সঠিক নিয়মে না খেলে এ সকল সমস্যা গুলো দেখা দিতে পারে। এর
কারণে নিম পাতার গুড়া খাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।
নিম পাতার গুড়া তৈরি করার উপায়
আমরা চাইলে নিম পাতার গুড়া বাড়িতেই তৈরি করতে পারি। তাহলে চলুন জেনে নেই নিম
পাতার গুড়া তৈরি করার উপায় গুলো। নিম পাতার গুড়া তৈরি করার জন্য প্রথমত আমাদের
তাজা নিমপাতা সংগ্রহ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে নিম পাতাগুলো যেন সুস্থ, সবুজ ও
দাগহীন হয়। রাস্তার ধলো বা কীটনাশক লেগে থাকা পাতা এড়িয়ে চলতে হবে। এরপর
সংগ্রহ করা পাতাগুলো পরিষ্কার পানিতে ২-৩ বার ধুয়ে নিতে হবে। যাতে পাতাতে থাকা
ময়না ও জীবাণু দূর হয়।
আরও পড়ুনঃ ব্রণের গর্ত দূর করার ঘরোয়া উপায়
এরপর পানি থেকে নিমপাতা গুলো ছেঁকে নিয়ে তা ছায়াযুক্ত স্থানে শুকাতে হবে। কারণ
তাজা ও ভেজা পাতা গুড়া ভালো হবে না। মিমের পাতাগুলো রোদে না শুকিয়ে ছায়াযুক্ত
জায়গায় শুকাতে হবে কারণ রোদ পুষ্টিগুণ নষ্ট করে। পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগতে
পারে পাতাগুলো ভালোভাবে শুকাতে। এরপর পাতাগুলো মচমচে হয়ে শুকালে বা হাত দিয়ে
ভাঙলে মিক্সার, ব্লেন্ডার অথবা শিলপাটা দিয়ে গুঁড়ো করুন। এরপর সেই গুরুপ গুলো
ভালোভাবে চেলে নিয়ে মোটা অংশগুলো ফেলে দিয়ে কাঁচের বোতলে ভরে সংরক্ষণ করুন।
এরপর বোতলের ঢাকনা বন্ধ করে শুকনো ও ঠান্ডা জায়গায় রাখুন। এভাবে রাখলে ২-৩ মাস
ভালো থাকবে।
নিম পাতার রস খেলে কি হয়
আমরা জানলাম নিম পাতার গুড়া খাওয়ার নিয়ম ও নিম পাতার গুড়া খেলে কি কি
উপকারিতা পাওয়া যায়। তবে আমাদের এটাও জানা উচিত নিম পাতার রস খেলে কি হয়।
প্রাচীনকাল থেকেই নিমপাতা হলো আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত উপাদান। এই নিম
পাতার রস খেলে শরীরে অনেক উপকারিতা পাওয়া যায়। নিমপাতা তে রয়েছে প্রাকৃতিক
এন্টিভাইরাল ও এন্টিব্যাকটেরিয়াল গুন যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী
উপাদান।
নিম পাতার রস আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। শরীর থেকে খারাপ টক্সিন বের
করে ফেলে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং রোগ জীবাণু
দূর কর ইত্যাদি। সাধারণত এই নিম পাতার রস সকালে খালি পেটে পানি বা লেবুর সাথে
মিশিয়ে খাওয়া সবচেয়ে ভালো। তবে অতিরিক্ত বা নিয়মিত খাওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ
ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আশা করছি বুঝতে পেরেছেন নিমপাতা আমাদের জন্য কত
উপকারী একটি প্রাকৃতিক উপাদান।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিম পাতার ভুমিকা
ডায়াবেটিস হল বর্তমানে সবচেয়ে সাধারণ একটি রোগ। এই রোগ প্রায় অনেক মানুষেরই
দেখা যায়। রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলেই ডায়াবেটিস হয়। তাই রক্তের শর্করার
মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন কাল থেকেই ডায়াবেটিস
নিয়ন্ত্রণে নিমপাতা কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই নিমপাতা তে থাকা
প্রাকৃতিক উপাদান গুলো আমাদের দেহের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অভিজ্ঞ ডাক্তারদের মতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিম পাতার ভূমিকা অপরিসীম। নিম
পাতার উপস্থিতি আমাদের শরীরের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য
করে। চিনিতে প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজ রয়েছে তাই এই নিম পাতা তিতা হওয়ার কারণে
রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যাওয়া রোধ করে। অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
বাড়ায়। এই নিম পাতা মেটাবলিজম বাড়িয়ে অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সাহায্য করে যা
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। আশা করছি বুঝতে পেরেছেন ডায়াবেটিসের
রোগীদের জন্য নিমপাতা কতটা প্রয়োজনীয়।
গর্ভবতী নারীদের কেন নিম পাতার গুড়া ক্ষতিকর
সাধারণত গর্ভবতী নারীদের নিম পাতার গুড়া খাওয়া সুরক্ষিত নয়। যেহেতু নিমপাতার
গুড়ার উপকারিতাও এবং অপকারিতাও রয়েছে তাই গর্ভবতী মায়েদের জন্য এটি না খাওয়াই
উত্তম। মিমের কিছু যৌগ যেমন নিমের তেল বা কন্সেন্ট্রেটেড এক্সট্রাক্ট গর্ভাশয় কে
উদ্দীপিত করে ফলে গর্ভপাতের ঝুঁকি মারতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে অত্যাধিক
নিমের যৌগ বাচ্চার বিকাশের প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুনঃ কালোজিরা ফুলের মধু চেনার উপায়
অনেক সময় নিম রক্তপাত বাড়াতে বা রক্তচাপ কমাতে পারে তাই গর্ভাবস্থায় এটি
বিপদজনক হতে পারে। মূলত সেই কারণেই গর্ভবতী নারীদের নিম পাতার গুড়া খাওয়া
ক্ষতিকর। গর্ভবতী অবস্থায় একজন মহিলাকে অনেক কিছু মেনে চলতে হয়। বাচ্চাকে সুস্থ
রাখতে গর্ভবতী মহিলাদের যে সকল উপাদানে ঝুঁকি রয়েছে সেগুলো না ব্যবহার করাই
উত্তম। নিম পাতার গুড়া খেলে গর্ভবতী নারীদের বমি ও ডায়রিয়ার মত সমস্যা হতে
পারে যা গর্ভাবস্থায় দারুন ভাবে শারীরিক দুর্বলতা ও ডিহাইড্রেশন ঘটাতে পারে। আশা
করছি বুঝতে পেরেছেন কেন গর্ভবতী নারীদের নিম পাতার গুড়া এড়িয়ে চলা উচিত।
শেষ কথাঃ নিম পাতার গুড়া খাওয়ার নিয়ম
উপরে পুরো পোস্টে জুড়ে আমি আপনাদের সাথে নিম পাতার গুড়া খাওয়ার নিয়ম ও
নিমপাতার সকল উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করলাম। নিমপাতাতে
থাকা প্রাকৃতিক উপাদান আমাদের দেহের জন্য খুবই উপকারী। বিশেষভাবে ডায়াবেটিস
রোগীদের জন্য নিম পাতার গুড়া খুবই উপকারী। নিম পাতা খাওয়ার যেমন উপকারিতা
রয়েছে তেমনি কিছু অপকারিতাও রয়েছে তাই নিম পাতার গুড়া খাওয়ার ক্ষেত্রে
সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
কিছু গবেষণায় দেখা যায় গর্ভবতী নারীদের জন্য নিম পাতার গুড়া ক্ষতিকর। তাই
গর্ভবতী নারীদের এই নিম পাতার গুড়া এড়িয়ে চলা উচিত। আপনারা যারা নিম পাতার
গুড়া খেতে চান তারা চাইলে সহজেই বাড়িতেই নিম পাতার গুড়া তৈরি করতে পারেন। নিম
পাতার গুড়া কিভাবে তৈরি করতে হয় তা আমি উপরে আলোচনা করেছি। আমার মতে নিম পাতার
গুড়া আমাদের শরীরের জন্য উপকারী তবে তা সঠিক নিয়মে খাওয়া উচিত। আশা করছি বুঝতে
পেরেছেন। পোস্টটি আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে তা কমেন্টে জানাবেন।



আমাদের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url